রাখে আল্লাহ মারে কে

13

অনলাইন ডেস্ক: ‘বাবা গো, নিজের জানডা বাঁচানির লাইগ্যা নাক বন্ধ কইরা আছিলাম। আমারে সবাই মিইল্যা মারছে। হাতে ধরছি, পায়ে ধরছি। কইছি মামলা তুইল্যা নিয়াম। জানডা ভিক্ষা দেও আমারে। এর পরও শোনে নাই। মনে করছে মইরা গেছি। হাত-পা বাইন্ধা বস্তায় ভইরা নিয়া রাস্তায় ফালাইয়া দিছে। আল্লাহ বাঁচাইয়া দিছে। কিন্তু আমারে এখনো মারতে চায়। হাসপাতালে আইয়াও খুঁইজ্যা গেছে।’

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে এভাবেই কথাগুলো বলছিলেন পঞ্চাশোর্ধ্ব কল্পনা বেগম। বর্তমানে তার দুই পা ভাঙা। বাঁ পায়ের একটা হাড় তিন জায়গায় ভেঙেছে। আর কোনোদিন স্বাভাবিক হতে পারবেন কি না, জানেন না। তার এই হাল করেছে তার স্বামী মজিবর মুন্সী এবং দেবররা। নেপথ্যে জমি দখলের পাঁয়তারা।
গত ১৮ মার্চ সন্ধ্যায় রোমহর্ষক এ ঘটনা ঘটে মাদারীপুরের কবিরাজপুর ইউনিয়নের কবিরাজপুর গ্রামে। কল্পনা বেগমকে নির্যাতনকারীরা তাদের বাড়িতে তুলে নিয়ে দরজা বন্ধ করে বর্বর নির্যাতনের পর মৃত ভেবে হাত-পা বেঁধে মাইক্রোবাসে তোলে। এরপর প্রায় ৫০ কিলোমিটার দূরে ফরিদপুরের ভাঙ্গা উপজেলার পুকুরিয়া এলাকায় নিয়ে রাস্তার পাশে ছুড়ে ফেলে দেওয়া হয়। এরপর এক ট্রাকচালক তাকে মুমূর্ষু অবস্থায় উদ্ধার করে প্রথমে ভাঙ্গা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যান। সেখান থেকে ছোট ছেলে শরীফুল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগ করে পাঠানো হয় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে।

কবিরাজপুর গ্রামের সবাই এ ঘটনা জানলেও মুখ খুলতে সাহস পাচ্ছেন না কেউই। এতে আরও বেপরোয়া হয়েছে নির্যাতনকারীরা। ভুক্তভোগীর ভয়, তাকে আরেকবার সুযোগ পেলে মেরেই ফেলবে।

ঘটনার আদ্যোপান্ত জানতে গিয়ে মেলে ভয়ানক সব তথ্য। নিম্নবিত্ত পরিবারের সন্তান কল্পনা বেগমের পুরোটা জীবন কেটেছে সংগ্রামে। বাবার বাড়ি নেত্রকোনা হলেও বিয়ে হয়েছিল মাদারীপুরের কবিরাজপুরে। কিন্তু কপালে সুখ জোটেনি। স্বামী মজিবর মুন্সী করেছেন ৯ বিয়ে। তিন ছেলের মধ্যে বড় দুই ছেলে খোঁজ নেয় না। একমাত্র ছোট ছেলে সবার সঙ্গে যুদ্ধ করে পাশে আছে মায়ের। কল্পনা তার সারা জীবনের জমানো পুঁজি দিয়ে দেবর বাশার শরীফ, সিদ্দিক শরীফ এবং আবু আলী শরীফের কাছ থেকে ছয় শতাংশ জমি কিনেছিলেন প্রায় ১২ বছর আগে। কিন্তু সাড়ে ৩ লাখ টাকা দেওয়ার পরও সেই জমির দলিল আজ পর্যন্ত বুঝিয়ে দেওয়া হয়নি। এলাকার জনপ্রতিনিধিসহ সবার কাছে গেলেও কোনো সুরাহা হয়নি। নিরুপায় হয়ে তিনি আদালতের দ্বারস্থ হয়ে ২০১৯ সালে প্রতারণার মামলা করেন। সেই মামলায় ২০২৩ সালে তাদের পাঁচ মাসের সাজা হয়। এরপর ১৭ দিন জেল খেটে জামিনে বের হয়ে কল্পনাকে হত্যার পরিকল্পনা করেন। পরিকল্পনায় যুক্ত করেন কল্পনার স্বামী মজিবর মুন্সী এবং আরেক দেবর হাবিবার মুন্সীকে। তাদের বলা হয়, কল্পনার মৃত্যুর পর তার সব জমি তাদের দেওয়া হবে। কল্পনার বড় দুই ছেলেকেও প্রলোভন দেখানো হয়, মাকে ছেড়ে তাদের পাশে থাকলে কানাডা পাঠিয়ে দেওয়া হবে। একমাত্র ছোট ছেলে শরীফুলকে বশে আনতে না পেরে তাকে প্রতিনিয়ত হুমকি দেওয়া হচ্ছে। তারা হুমকি দিচ্ছে, অস্ত্র ও মাদকের মামলা দিয়ে গ্রেপ্তার করানো হবে। তার মা ঢাকা মেডিকেলে একা একা থেকে মরে যাবে। কিছুই করতে পারবে না।

দুর্দশার কথা বর্ণনা করতে গিয়ে হাসপাতালে কান্নাজড়িত কণ্ঠে কল্পনা বেগম জানান, তিনি বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত। চিকিৎসা করানোর মতো আর্থিক সামর্থ্য না থাকায় আবেদন করেছিলেন সমাজসেবা অধিদপ্তরে। এখন অন্য চিকিৎসা করানো তো দূরের কথা, নিজের এবং ছেলের জীবনের নিরাপত্তা নিয়েই শঙ্কিত তিনি।

তিনি বলেন, ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানসহ এলাকার সবার কাছে গিয়েছি। কিন্তু আমার স্বামী এবং দেবররা কারও কথাই শোনেননি। আমি বাধ্য হয়ে আদালতের দ্বারস্থ হয়েছি। যে জমি কিনেছিলাম সেটা তো আমাকে দিলই না, আমার যা আছে তাও কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে।

কল্পনার ছেলে শরীফুল ইসলাম বলেন, আমি থাকি ঢাকায়। বাবা এবং চাচাদের অত্যাচারে মাদারীপুর থেকে এক প্রকার পালিয়ে এসেছি বলা যায়। এর আগেও তারা আমার ওপর হামলা করে হাত ভেঙে দিয়েছিল। এখন আবার তারা আমাকে মেরে ফেলবে বলে হুমকি দিচ্ছে। কয়েকদিন আগে মাকে নিয়ে গিয়েছিলাম টেস্ট করাতে। তখন কয়েকজন লোক এসে নাকি আমাদের খুঁজে গেছে, আর হাসপাতালে বলে গেছে মায়ের নাকি সড়ক দুর্ঘটনা হয়েছে। কোনো হামলার ঘটনা ঘটেনি।

তিনি বলেন, তারা আমাকে মিথ্যা অস্ত্র ও মাদক মামলা দিয়ে গ্রেপ্তার করাতে চাচ্ছে। আমাকে জেলে নিতে পারলে মায়ের চিকিৎসা করানোর মতো আর কেউ থাকবে না। এভাবে মরে গেলে তাদের রাস্তা পরিষ্কার হয়ে যায়।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে কবিরাজপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান টিপু সুলতান মাতুব্বর বলেন, অনেক বছর ধরে তাদের এই পারিবারিক ঝামেলা চলছে। অনেকবার সালিশ করেছি। তারা যদি না মানে, তৃতীয় পক্ষ হয়ে তো বেশি কিছু করা যায় না। কল্পনা বেগমকে মারধরের বিষয়ে কিছু জানেন না বলে জানান তিনি।